| কোড: 323180 | তারিখ: 2012/06/19 - 10:06 | সূত্র: আবনা | print |
আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা আবনার রিপোর্ট : হিজবুল্লাহ বাহিনী’র প্রধান সৈয়দ হাসান নাসরুল্লাহ ইরানের চার নাম্বার চ্যানেল হতে প্রচারিত ‘ফারাসু’ অনুষ্ঠানকে একান্ত সাক্ষাতকার প্রদান করেছেন। সাক্ষাতকারে তিনি লেবাননের অভ্যন্তরিন বিষয়সহ মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত ব্যক্ত করেছেন। সাক্ষাতকারটিকে মোট চার পর্বে আবনা পাঠকদের উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আগামীতে যা পড়বেন তা উক্ত সাক্ষাতকারের দ্বিতীয় পর্ব।
প্রশ্ন : জায়নবাদী ইসরাইলের লেবানন ত্যাগ কি একটি রণকৌশল ছিল, নাকি তারা বাধ্য হয়ে পশ্চাদপসারণ করেছে?
নাসরুল্লাহ : তারা ১৯৮২ সালে বৈরুত অবধি পৌঁছে দেশের অর্ধেক মাটি দখল করে নেয়। প্রতিরোধ আন্দোলন ঐ যুগে গঠিত হয় এবং ইসরাইলকে কঠিন আঘাত করতে সক্ষম হয়। আর ঐ সময় হিজবুল্লাহ তাদেরকে সাইদা অঞ্চলের দিকে পশ্চাদপসারণে বাধ্য করেছিল। যদি লেবাননের সামরিক বাহিনী হত তবে ইসরাইল পশ্চাদপসারণ করতো না। কিন্তু যখন তারা দেখলো যে, তাদের প্রতিপক্ষ হিজবুল্লাহ তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে অভিযান চালাচ্ছে তখন তারা পশ্চাদপসারণ করতে বাধ্য হয়, কেননা তার হিজবুল্লাহ’র অভিযানসমূহে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। ২০০০ সালের ৫ই মে ইসরাইলের পরাজয় হয়েছিল, আর তারাও একথা বলে।
প্রশ্ন : ৩৩ দিনের যুদ্ধে হিজবুল্লাহ’র বিজয়, হিজবুল্লাহর শক্তির কারণে সম্ভব হয়েছিল নাকি জায়নবাদীদের দূর্বলতার কারণে?
নাসরুল্লাহ : এ বিজয় ছিল মহান আল্লাহর বৃহৎ সাহায্য। আর যা কিছু ঘটেছিল তা ছিল মোজেযা সাদৃশ্য। নিঃসন্দেহে ইসরাইলের সামরিক বাহিনী এ অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিধর বাহিনী, আর আমাদের যুদ্ধ ছিল মূলতঃ আকাশ পথের যুদ্ধ।
হিজবুল্লাহ ও জায়নবাদী সামরিক বাহিনী’র মাঝে সংখ্যা, উপকরণ ও সক্ষমতার কোন দিক থেকেই মিল ছিল না। একদল সংগ্রামী তারা নিজের দায়িত্ব মনে করে দায়িত্ব পালন করেছে এবং মহান আল্লাহও তাদেরকে সাহায্য করেছেন। সাধারণ বিবেচনায় আমি বুঝি না যে, ৩৩ দিনের ঐ যুদ্ধে কি ঘটেছিল। আমার এ বিষয়টি নিশ্চিতভাবে জানি যে, আমাদের নিকট কি রয়েছে আর ইসরাইলের নিকট কি রয়েছে।
প্রশ্ন : মহান আল্লাহর এমন সাহায্য আপনাদের ভাগ্যে জুটেছে এর রহস্য কী?
নাসরুল্লাহ : বান্দাকে পরীক্ষা করার পর মহান আল্লাহর নিজের অনুগ্রহ প্রদান করেন। যা কিছু বিগত ১০ বছরে লেবাননে ঘটেছে বিশেষতঃ ১৯৮২ সালের পর হতে নিষ্ঠাবান জনগণই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এবং অসংখ্য লোক শহীদ, আহত হয়েছে ও আত্মত্যাগ করেছে। মহান আল্লাহর প্রতি তাদের বিশ্বাস এ বছরগুলোর পর দৃঢ় ঈমানে পরিণত হয়েছে। আর তারা এটা প্রমাণ করেছে যে, এ মহান আত্মোত্সর্গের জন্য তারা প্রস্তুত। ৩৩ দিনের যুদ্ধে যে পরিমাণে ক্ষেপণাস্ত্র জনগণের উপর ইসরাইল নিক্ষেপ করেছিল তার সংখ্যা ইসরাইল-আরব যুদ্ধে নিক্ষেপিত ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে বেশী। কিন্তু কোন মুজাহিদই পিছুপা হয়নি এবং রণক্ষেত্র ত্যাগ করেনি। আর এ আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি ২০ বা ৩০ বছরের প্রতিরোধেরই ফল।
প্রশ্ন : ৩৩ দিনের যুদ্ধের পর জায়নবাদী ইসরাইল ঘোষণা করেছিল যে, তারা হিজবুল্লাহ’র সকল পরিকাঠামো ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে এবং হিজবুল্লাহ পূর্বের মত আর শক্তিধর নেই, আপনি এ কথাটি কতটুকু সত্য বলে মনে করেন?
নাসরুল্লাহ : বর্তমানে স্বয়ং ইসরাইলই বলছে যে, হিজবুল্লাহ ২০০৬ সালের চেয়ে কয়েকগুন বেশী শক্তিশালী হয়েছে। হিজবুল্লাহ’র শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ইসরাইল এর জন্য বিশেষ কর্মসূচীও গ্রহণ করেছে।
প্রশ্ন : ২০০৬ সাল হতে এ পর্যন্ত হিজবুল্লাহর মধ্যে কি পরিবর্তন এসেছে?
নাসরুল্লাহ : হিজবুল্লাহ গণমূখী একট সংগঠন ও পূর্ব হতে শক্তিশালী একট সংগঠন হওয়ায়, এর সৈন্য সংখ্যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পূর্বের তুলনায় এর সামরিক শক্তিতেও বৃদ্ধি ঘটেছে।
হিজবুল্লাহ’র ক্ষেপণাস্ত্রসমূহ দখলকৃত ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডের যেকোন টার্গেটকে আঘাত হানার ক্ষমতা রাখে এবং জায়নবাদী ইসরাইলের কর্তৃপক্ষরা বলেছেন যে, হিজবুল্লাহ’র কাছে যে ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি রয়েছে বিশ্বের শতকরা ৯০ ভাগ দেশের নিকট তা নেই। বর্তমানে হিজবুল্লাহ’র সামরিক শক্তি পূর্বের সাথে তুলনা হয় না।
প্রশ্ন : কেউ কেউ হিজবুল্লাহকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ফ্রন্টলাইন হিসেবে বলার চেষ্টা করে; এমনভাবে যে, কেউ কেউ ২০০৬ সালের যুদ্ধকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বে যুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করেছেন। হিজবুল্লাহ ও ইরানের সম্পর্ক কি এমন, নাকি হিজবুল্লাহ’র স্বকীয়তা ইসলামি হওযার কারণে সহযোগিতা লাভ করে?
নাসরুল্লাহ : যা কিছু লেবানন ও মধ্যপ্রাচ্যে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে তা হল, এ যুদ্ধ ছিল হিজবুল্লাহ ও জায়নবাদী ইসরাইলের যুদ্ধ। কিন্তু পর্দার আড়ালে অন্যান্য কথাও বলা হয়। ইসলামি বিপ্লবের মহান নেতা জুমআর খোতবায় বলেছিলেন যে, আমরা মধ্যপ্রাচ্যের সকল (ইসলামি) প্রতিরোধ আন্দোলনকে সহযোগিতা করবো, আর এটি হচ্ছে তার অন্যতম বাস্তবতা।
হিজবুল্লাহ লেবাননের একটি দল এবং এর নেতারাও লেবাননিজ। একদিন লেবাননের এক রাজনৈতিক বৈঠকে –যেখানে উপস্থিত সকলেই ছিলেন লেবাননের বিভিন্ন পদের কর্মকর্তারা- উপস্থিত ছিলাম। তাদের মধ্য হতে একজন বললেন : হিজবুল্লাহ ইরানের জন্য যুদ্ধ করে। কিন্তু আমি বললাম হিজবুল্লাহ লেবাননের জন্য যুদ্ধ করে এবং ইরান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সাহায্য করে। কিন্তু সে কুরবাতান ইলাল্লাহ (বা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন) সম্পর্কে কিছুই জানতো না।
তাকে বললাম, এমন কোন দৃষ্টান্ত আছে কি যে, আমাদের যুদ্ধ ইরানের স্বার্থে গেছে এবং লেবানের স্বার্থে যায়নি? তারা কোন দৃষ্টান্তই উপস্থাপন করতে পারেনি। যদি হিজবুল্লাহ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সহযোগিতায় লেবাননকে মুক্ত করা এবং এদেশের সম্মান রক্ষা ও পানি রক্ষার জন্য যুদ্ধ করে তবে তাতে কি সমস্যা রয়েছে? আমাদের উচিত ইরানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো। কেননা তারা আমাদেরকে নিজের দেশ রক্ষার সুযোগ দিয়েছে। হিজবুল্লাহ’র সাথে ইরানের সম্পর্ক আকিদাগত, ঈমানী এবং ইসলামি। এ বিষয়ে প্রতিরোধ আন্দোলনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে ইসলামি প্রজাতন্ত্র একটি পৃষ্ঠপোষক ও সহযোগী।
যখন ইসরাইল পরাজিত হয় বা দূর্বল হয়ে যায়, তখন এর ফল যৌথভাবে লেবানন, ফিলিস্তিন, মিশর ও ইরানসহ সকল মুসলিম দেশ লাভ করে। আমরা এ বিষয়ের প্রতি এভাবেই দৃষ্টি দেই। এটা শুধুমাত্র উভয় পক্ষের মাঝে রাজনৈতিক কোন সম্পর্ক নয় বরং আকিদাগত, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সম্পর্ক।#