Abna.ir


ধর্মীয় ছাত্রদের ন্যায় ধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে বিভিন্ন গ্রামে-গ্রামে সফর করতে আমি পছন্দ করি
সৈয়দ হাসান নাসরুল্লাহ’র সাক্ষাতকার (পর্ব-৪)
ধর্মীয় ছাত্রদের ন্যায় ধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে বিভিন্ন গ্রামে-গ্রামে সফর করতে আমি পছন্দ করি

সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ বলেছেন : যদি হিজবুল্লাহ’র দায়িত্ব নেওয়ার মত কোন ব্যক্তি আসে, তবে তখন আমি (দায়িত্ব অর্পন পূর্বক) একজন ধর্মীয় ছাত্রের ন্যায় কাজ করব; পড়াশুনা করবো ক্লাস নেব এবং ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এক মসজিদ হতে আরেক মসজিদে ও এক গ্রাম হতে আরেক গ্রামে যাবো।

আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা আবনার রিপোর্ট : লেবাননের হিজবুল্লাহ বাহিনী প্রধান সৈয়দ হাসান নাসরুল্লাহ ইরানের চার নম্বর চ্যানেল হতে প্রচারিত ‘ফারাসু’ অনুষ্ঠানকে একান্ত সাক্ষাতকার প্রদান করেছেন। সাক্ষাতকারটি ইরান টিভির ঐ চ্যানেল হতে প্রচারিত হয়। এতে তিনি লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতমত ব্যক্ত করেছেন। দীর্ঘ এ সাক্ষাতকারটি আবনা পাঠকদের জন্য ৪ পর্বে উপস্থাপন করা হল। আগামীতে যা কিছু পড়বেন তা উক্ত সাক্ষাতকারের চতুর্থ এবং শেষ পর্ব।

 

প্রশ্ন : ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ইসরাইলের মনপূত সমাধান অর্জনের লক্ষ্যে তাদের পাশে থাকার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে কোন প্রকার সুবিধা আপনাকে দিতে প্রস্তুত [এ সম্পর্কে আপনার মতামত কি?]।

নাসরুল্লাহ : আমরা অসংখ্য শহীদ এ রাস্তায় উত্সর্গ করেছি যাদেরকে কোন মূল্যে বিনিময় করা সম্ভব নয়। এটা একট ন্যায্য অধিকার এবং ফিলিস্তিন, ফিলিস্তিনীদের ভূমি। ইহুদিদের উচিত তারা যেস্থান হতে এসেছে সেখানে ফিরে যাওয়া। সর্বোপরী মুসলমান, খ্রিষ্টান ও ইহুদি নির্বিশেষে ফিলিস্তিনী জাতিই ভবিষ্যত সরকারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

 

প্রশ্ন : সিরিয়া সমস্যার সমাধান কিভাবে সম্ভব?

নাসরুল্লাহ : সিরিয়ার সমস্যা সংশোধন বিষয়ক নয়। যতদিন যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা বিশ্ব, ইসরাইল এবং কিছু কিছু আরব দেশ –ইসরাইলের বিষয়ে যাদের অবস্থান স্পষ্ট- আল-কায়েদার মাধ্যমে সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন ঘটানোর অপচেষ্টা চালাবে ততদিন তাদের সমস্যা সংশোধন কেন্দ্রিক নয়। কিছু কিছু আরব দেশে কোন নির্বাচন বা সংশোধন হয়না এবং ক্ষমতা হস্তান্তরও হয় না তবুও তাদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর, সুতরাং সিরিয়ার প্রধান সমস্যা, সংশোধন বিষয়ক নয়।

মিশর, জর্ডান এবং ফিলিস্তিনের স্বশাসিত সরকার ইসরাইলের সাথে সমঝোতা করেছে, যদি সিরিয়া সরকারও জায়নবাদীদের সাথে সন্ধি করতো তবে সিরিয়া সমস্যার সমাধান হত, কিন্তু এক্ষেত্রে ফিলিস্তিনীদের অধিকার পদদলিত হত।

বাশার আসাদ বলেছেন, তিনি সংশোধন ও সংলাপে বসার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন, কিন্তু তারা তা গ্রহণ করেনি। সুতরাং তাদের মাথা ব্যাথা সংশোধনের বিষয়ে নয়। বরং তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকারের পতন ঘটানো অথবা ফিলিস্তিনের বিষয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গীতে পরিবর্তন আনা। সমাধানের একমাত্র রাস্তা হচ্ছে সংলাপে বসা। অপর যে কোন রাস্তাই সিরিয়াকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে। আমি মনে করি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সিরিয়া ধ্বংস করারই পরিকল্পনা এঁটেছে।

এটা অসম্ভব বলে মনে হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, তুরস্ক, সৌদি আরব ও কাতার সিরিয়ায় সংশোধন চায়।

 

প্রশ্ন : ঘটমান পরিবর্তন সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গী কি? এ সকল ঘটনাকে আপনি ইসলামি জাগরণ বলে মনে করেন, নাকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা পরিচালিত বলে মনে করেন?

নাসরুল্লাহ : মধ্যপ্রাচ্যের গণবিক্ষোভসমূহ ছিল বাস্তব এবং কারো কারো ‘এ সকল জাগরণ নাটক বৈ কিছুই নয়’-এ শীর্ষক দাবী সঠিক নয়। এ সকল জাগরণ এখন বাস্তবতা লাভ করছে যদিও কয়েক দশক পূর্বে এ সকল ঘটনা ও পরিবর্তনের আশা করা হয়েছিল। ইসলামি বিপ্লবের বিজয় মধ্যপ্রাচ্যের জন্য আদর্শ স্বরূপ ছিল এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘটনা এর পর হতেই শুরু হয়েছে, যার জন্য প্রয়োজন ছিল সময়ের। অতঃপর প্রতিরোধ আন্দোলন গঠিত হয়, ফিলিস্তিনীদের গণঅভ্যূত্থান, ৩৩ দিনের যুদ্ধ, ২২ দিনের যুদ্ধ, ইরাকের জনগণের দৃঢ়তায় ইরাকে মার্কিনীদের পরাজয় [এ অঞ্চলের] জনগণের জন্য ভবিষ্যতের গঠণের উদ্দেশ্যে একটি নয়া দিগন্তের উন্মোচন করেছে।

সমঝোতাপ্রিয় ও দূর্বল সরকারসমূহ কোন কাজ করতো না, তারা জনগণের বিপ্লব করার ক্ষেত্র নিজেরাই প্রস্তুত করেছে। এ সকল পরিবর্তনের কারণ বিপ্লবের কয়েক সপ্তাহে পূর্বের ঘটনার মাঝে সীমাবদ্ধ নয় বরং কয়েক দশক পূর্ব হতে শুরু হয়েছে।

আমি বিশ্বাস করি যে, এ সকল গণবিপ্লব সত্য, আর যখন মহান রাহবার বলেন এটা ইসলামি জাগরণ, তখন এটা অবশ্যই সত্য। বিজয়ের পর এ সকল বিপ্লবের মূল বিষয়টি হচ্ছে যে, এ সকল জাতীয় বিপ্লব কি তাদের কষ্টের ফল ঘরে তুলতে পারবে নাকি যুক্তরাষ্ট্র ও তার ভাড়াটেরা এসে এর ফলাফলকে নিজেদের থলেতে ভরবে।

এ বিষয়টি বর্তমানে লিবিয়া, তিউনিশিয়া ও মিশরে ঘটছে কিন্তু বাহরাইনে [স্বৈরাচারী সরকার কর্তৃক] দমননীতি অবলম্বনের কারণে তাতে বাধা পড়েছে।

 

প্রশ্ন : সিরিয়া ও বাহরাইনের বিষয়ে কেন আপনার দৃষ্টিভঙ্গী পৃথক?

নাসরুল্লাহ : সিরিয়ার ক্ষমতাসীন সরকার শিয়া নয় সেকুলার। আমরা শুরু থেকেই তিউনিশিয়া, লিবিয়া, মিশর, বাহরাইন অতঃপর সিরিয়ায় আগত পরিবর্তনের বিষয়ে দু’টি মাণদণ্ড রেখেছি। প্রথমতঃ ইসরাইলের বিষয়ে ঐ সরকারের অবস্থান এবং দ্বিতীয়তঃ সংশোধনের জন্য প্রস্তুতি। যদি কোন সরকার ইসরাইলের বন্ধু হয় তবে তারা সংশোধনের জন্য প্রস্তুত নয়; এক্ষেত্রে উক্ত সরকারের পতন আমরা চাই। কিন্তু যদি সংশোধনের পক্ষে থাকে এবং ইসরাইলের শত্রু হয় তবে তার পতন রোধের প্রতি আমরা সমর্থন জানাই। আর আমরা এ বিষয়ে সংলাপের প্রতি সমর্থন জানাই।

বাহরাইনে একের অধিক দৃষ্টিভঙ্গী রয়েছে; কেউ কেউ সরকারের পতন, আবার কেউ কেউ সংশোধের বিষয়ে বিশ্বাসী। আমরা বাহরাইনের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবো না, তবে বাহরাইনের জনগণের প্রত্যয়ের প্রতি সম্মান জানাই। কিন্তু বাহরাইন সরকারের সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক রয়েছে এবং তারা সংশোধনের পক্ষপাতী নয়। বাহরাইনের জনগণের উত্থান শান্তিপূর্ণ হলেও সরকার তাদের ন্যায্য দাবীর জবাব হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দিয়েছে।

 

প্রশ্ন : ইমাম খোমেনী (রহ.) থেকে হুকুম লাভের বিষয়টি কী?

নাসরুল্লাহ : ২২ বছর বয়সে আমি ইমাম খোমেনী’র সাথে সাক্ষাত করেছি। ইমাম খোমেনীও আমাকে খুমস হতে ইমামের অংশ গ্রহণের অনুমোদন পত্র প্রদান করেছিলেন। এ ধরণের অনুমোদন পত্র ঐ সময় ৭ বা ৮ জন লেবাননীজকে দেওয়া হয়েছিল এবং আমি ছিলাম তাদের মধ্যে একজন।

 

প্রশ্ন : আপনার পুত্র মুহাম্মাদ হাদী’র শাহাদাত সম্পর্কে বলুন।

নাসরুল্লাহ : তার শাহাদাত ছিল প্রত্যাশিত, কেননা সে [ইসরাইল বিরোধী] প্রতিরোধে সক্রিয় ছিল। মুহাম্মাদ হাদী’র শাহাদাতের ঘটনা আমার জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল না। মুহাম্মাদ হাদী’র শাহাদাত আমার জন্য গর্বের কারণ। যখন আমার পুত্র শহীদ হয়েছিল তখন বলেছিলাম, আল্লাহর তোমার চেহারাকে উজ্বল করুন।

আমার ৪টি সন্তান রয়েছে, ৩টি পুত্র এবং একটি কন্যা সন্তান। আমার সন্তানদের মধ্যে একটি সন্তান ছোট; ১১ বছরের। বাকি দু’টি হিজবুল্লাহ’তে সক্রিয়।

আমি আমার সন্তানদের উপর কোন কিছু চাপিয়ে দেই না। তারা স্বেচ্ছায় হিজবুল্লাহ’য় তত্পরতাকে বেছে নিয়েছে। যেভাবে আমাদের অনেক ভাই একই পিতা-মাতার সন্তান হওয়া সত্ত্বেও ‘আমাল’ শিয়া মুভমেন্টে সক্রিয় রয়েছে।

 

প্রশ্ন : এমাদ মুগনিয়াহ’র শাহাদাতের বিষয়ে কিছু বলুন।

নাসরুল্লাহ : আমরা এমাদ মুগনিয়ার রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণের বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেই, তার হত্যাকারীর জবাব প্রদান আমাদের কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে। এমাদ মুগনিয়ার মর্যাদার বিষয়টি দৃষ্টিতে রেখে তাদেরকে জবাব দেওয়া হবে যা। যদিও এ কাজটি দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং হয়তবা আরো সময় লাগতে পারে।

 

প্রশ্ন : কতদিন হিজবুল্লাহ’র নেতৃত্ব দেবেন?

নাসরুল্লাহ : হিজবুল্লাহ’তে আমার নেতৃত্বে স্থায়ী নয়। নেতৃত্ব দানকারী পরিষদ হয়তবা সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং আমাকে সরিয়ে আমার স্থলে অন্য কাউকে নিয়োগ দিতে পারে।

আমরা হিজবুল্লাহ’কে নেতৃত্ব দানের ক্ষেত্রে দলীয় নেতৃত্বে বিশ্বাসী। আমি লেবাননের হিজবুল্লাহ বাহিনী’র প্রধান নই। আমরা নেতৃত্ব দানকারী পরিষদে আলোচনা-পর্যালোচনা করি, অতঃপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি এবং অধিকাংশ যে পক্ষে রায় দেয় সেটাকেই হিজবুল্লাহ বাস্তবায়ন করে।

 

প্রশ্ন : আপনি যদি হিজবুল্লাহ’র প্রধান না হতে তবে কি কাজ করতে পছন্দ করতেন?

নাসরুল্লাহ : যদি হিজবুল্লাহ’র দায়িত্ব নেওয়ার মত কোন ব্যক্তি আসে, তবে তখন আমি (দায়িত্ব অর্পন পূর্বক) একজন ধর্মীয় ছাত্রের ন্যায় কাজ করব; পড়াশুনা করবো ক্লাস নেব এবং ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এক মসজিদ হতে আরেক মসজিদে ও এক গ্রাম হতে আরেক গ্রামে যাবো।

যদিও এ প্রশ্নটি কাল্পনিক, প্রকৃত অর্থে যদি কেউ এ দায়িত্বকে গ্রহণ করে তবে হিজবুল্লাহ’র যেখানে আমার প্রয়োজন অনুভূত হবে আমি সেখানে যোগ দেব।

আমার ব্যক্তিগত শখ হচ্ছে, বই পড়া। সর্বশেষ যে বইটি পড়েছি তা হচ্ছে লেবাননের এক লেখকের লেখা তাফসির গ্রন্থ।#



http://www.abna.ir/data.asp?lang=11&id=324036